//
চার মাধহাব ও কিছু প্রশ্ন

সারা পৃথিবীর সকল মুসলমানগণ আজ নিজেদের মধ্যেই বহুভাগে বিভক্ত। অন্যান্য অনেক ভাগ উপভাগের মধ্যে রয়েছে মাধহাব (মাযহাব) বা ফিকহ্‌ স্কুল নিয়ে বিভক্তি। ইসলাম এর প্রধান চারটি মাধহাব স্কুল হচ্ছেঃ

  • হানাফিয়াহ
  • মালিকি
  • শাফি’ই
  • হানবালি

এছাড়াও স্থানভেদে আরও কিছু মাধহাব প্রচলিত আছে।

আমাদের উপমহাদেশে মূলত হানাফিয়াহ মাধহাব প্রচলিত। এটা আমাদের এদিকে ছাড়াও চায়না, তুর্কি, ইরাক, আফগানিস্তান সহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচলিত।

মালিকিয়াহ মাধহাব সুদান, উত্তর ও মধ্য আফ্রিকাসহ আফ্রিকার বেশ কিছু জায়গায় প্রচলিত।

মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস্‌, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এর অধিকাংশ অধিবাসী এবং জর্দান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনের কিছু কিছু জায়গায় শাফি’ই মাধহাব এর অনুসরণ করা হয়।

অন্যদিকে হানবালি মাধহাব সাউদি আরব এবং আরব্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অনুসৃত হয়। এটা সাউদি আরব সরকার স্বীকৃত নির্ভরযোগ্য স্কুল। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, সবধরনের ঐকমত অথবা অন্যান্য হস্তক্ষেপকে বাইরে রেখে এই মাধহাবটি কুর’আন এবং সুন্নাহ কে অনেক কঠোরভাবে অনুসরণ করে। বর্তমানে এটি ওয়াহ্‌হাবিয়াহ মাধহাব নামে পরিচিত।

এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি নির্দিষ্ট কোন মাধহাব এর শিক্ষা অনুসরণ করব? নাকি প্রত্যেক মাধহাব স্কুল থেকে যেটা অধিকতর নির্ভরযোগ্য (কুর’আন ও হাদীথ) অনুসারে সেটা অনুসরণ করব? আসুন দেখি এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌র কুর’আন ও রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –এর সুন্নাহ আমাদের কোন পথে নিয়ে যায়।

মুসলমানদের একত্রিত হওয়া

মহিমান্বিত কুর’আনে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন,

“তোমরা সবাই মিলে আল্লাহ্‌র রশিকে শক্ত করে ধরে রাখ, এবং পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন হইয়ো না।“ [৩:১০৩]

কুর’আন হচ্ছে সেই রশি যেটা সকল মুসলমানের একত্রে আঁকড়ে ধরা উচিৎ। এই আয়াহ-তে আল্লাহ্‌ শুধু তাঁর রশি ধরতেই বলেননি, তিনি মুসলমানদের নিজেদের মাঝে বিভক্ত না হওয়ার কথাও বলেছেন।

কুর’আনে আরও বলা হয়েছে,

“আল্লাহ্‌ এবং রসূলকে (মুহাম্মাদ) অনুসরণ কর এবং যাঁরা এ ব্যাপারে দায়িত্তপ্রাপ্ত। যদি তোমাদের মধ্যে কোন কিছু নিয়ে মতবিরোধ হয়, (তাহলে সেটার মীমাংসা করার জন্য) আল্লাহ্‌ (এর কুর’আন) এবং তাঁর রসূলের (সুন্নাহ) দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, যদি তোমরা আল্লাহ্‌ এবং শেষদিনে বিশ্বাস করে থাক। [৪:৫৯]

সকল মুসলমানের উচিৎ কুর’আন এবং বিশুদ্ধ হাদীথের অনুসরণ করা এবং নিশ্চিত করা যে তারা নিজেদের মাঝে বিভক্ত নয়।

ইসলাম এ বিভক্তি সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

সাধারন ভাবে যখন কোন মুসলিমকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কোন রীতি অনুসরণ করেন কিংবা তিনি কোন মতে বিশ্বাসী, তখন  উত্তর হয়, হানাফি, মালিকি, শাফ’ই, হানবালি কিংবা শিয়া, সুন্নি, আহমাদিয়া, কাদিরিয়া ইত্যাদি।

আল্লাহ্‌ তা’আলা কুর’আনে বলেছেন,

“যারা নিজেদের ধর্মকে বিভক্ত করে এবং নিজেরাই বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়, তাদের সাথে আপনার (মুহাম্মাদ) কোন সংশ্লিষ্টতা নাই। তাদের (বিচারের) ভার আল্লাহ্‌র হাতে। তারা কি করেছে না করেছে, (শেষ বিচারের দিনে) তিনি তাদের সব জানাবেন।“ [৬:১৫৯]

এই আয়াহ-তে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন যে, যারা ইসলাম ধর্মে বিভক্তি সৃষ্টি করে এবং দল উপদলে বিভক্ত করে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকা উচিৎ।

চার মাধহাব

ইসলামিক দুনিয়া বহুত জ্ঞানী ইসলামিক বিশেষজ্ঞ (ইমাম) –দের জন্ম দিয়েছে। তবে এদের মধ্যে চারজন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং তাঁরা তাঁদের শিক্ষা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল যে, একজন মুসলমানকে হানাফি, মালিকি, শাফি অথবা হানবালি এর যে কোন একটা মাধহাব মেনে চলতে হবে, কিংবা এক মাধহাব অনুসরণ করলে অন্য মাধহাব এর অধিকতর যুক্তিসঙ্গত অথবা নির্ভরযোগ্য হাদীথ দ্বারা প্রমাণিত রীতি অনুসরণ করা যাবেনা।

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফি এবং ইমাম হানবাল (আল্লাহ্‌ তাঁদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোক) সহ ইসলামি সকল জ্ঞানী এবং বিদ্বান ব্যাক্তিদের আমাদের শ্রদ্ধা করতে হবে। তাঁরা সকলেই ছিলেন ইসলামের বিভিন্ন ব্যাপারে বিশেষভাবে জ্ঞানী। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁদের কঠোর পরিশ্রম এবং ইসলামিক গবেষণা ও শিক্ষার জন্য পুরস্কৃত করুক। কেউ যদি এই চারজন ইমামের মধ্যে কোন একজন কিংবা একাধিক ইমামের কোন মতামত কিংবা গবেষণার সাথে একমত হয় তাতে আপত্তির কোন অবকাশ নাই, যদি সেটা কুর’আন এবং বিশুদ্ধ হাদীথের পরিপন্থী না হয়।

চার ইমামের সবাই বলেছেন কুর’আন এবং হাদীথ অনুসরণ করতে

চার প্রধান ইমাম এর প্রত্যেকেই বলেছেন যে, তাঁদের কোন ফাতওয়া কিংবা অনুশাসন এর সাথে যদি আল্লাহ্‌র বাণী অর্থাৎ কুর’আন এবং নবীজির কথা অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য হাদীথের সাথে না মিলে, তাহলে ঐ নির্দিষ্ট ফাতওয়াটি অগ্রাহ্য হবে এবং রসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে।

দেখুন,

–      ইক্বাধ আল-হিমাম, আল ফুলানী (ইমাম আবু হানিফা)

–      জামি বাইয়ান আল-ইলম্‌ (ইমাম মালিক)

–      আন নাওয়ায়ির আল মাজমু’ (১/৬৩) (ইমাম শাফ’ই)

–      ইক্বাধ আল-হিমাম (ইমাম হানবাল)

এ সংক্রান্ত দুটি উদাহরণঃ

১. ইমাম শাফ’ই বলেছিলেন যে, যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে স্পর্শ করে, যদি তার স্বামী উদু করা অবস্থায় থাকে তবে তার উদু ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু ইমাম শাফ’ই এর এই ফাতওয়া নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –এর একটি বিশুদ্ধ হাদীথের পরিপন্থী।

হাদীথটি হচ্ছেঃ

আ’ইশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেন,

“নবীজি সল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমু দিয়ে নামায পড়তে বের হন। তিনি (পরে আর) উদু করেন নি।“ [সুনান আবু দাউদ, ১:১৭৮]

ইমাম শাফ’ই এর এই ফাতওয়াটি নিঃসন্দেহে রসূলর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –এর হাদীথের পরিপন্থী। সুতরাং আমরা যদি এই ফাতওয়াটি প্রত্যাখান করি তাতে সমস্যা নাই, যেহেতু ইমাম শাফ’ই নিজেই বলেছেন,

“আমি যদি কিছু বলি, তাহলে সেটা আল্লাহ্‌র গ্রন্থ এবং রসূলের সুন্নাহ এর সাথে মিলিয়ে দেখ। যদি মিলে যায় তবে গ্রহণ কর, যদি বিপক্ষে যায় তাহলে ছুঁড়ে ফেলে দাও।“ এটা আশ-শাফ’ই –এর বিবৃতি। দেখুন আন নাওয়াইর আল-মাজমু’ (১/৬৩)।

২. হানাফি মাধহাব অনুসারে সকল প্রকার নামাযের পূর্বে নিয়্যত মুখে আরবিতে উচ্চারণ করতে হয়। আরবিতে না পারলে নিজের ভাষায় পড়ারও নির্দেশ আছে। কিন্তু কোন সহীহ হাদীথ গ্রন্থেই নামাযের পূর্বে মুখে আরবিতে কিংবা মাতৃভাষায় নিয়্যত উচ্চারণের কোন দৃষ্টান্ত নাই।

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহু আকবার দিয়ে নামায শুরু করতেন।

আ’ইশাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেন যে,

“আল্লাহ্‌র রসূল তাকবীর (আল্লাহু আকবার; আল্লাহ্‌ মহান) দিয়ে নামায শুরু করতেন।“ [মুসলিম ৪:১০০৫]

এসংক্রান্ত আরও বহু হাদীথ পাওয়া যায় যেখান থেকে এ কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের শুরুতে কখনো নিয়্যত উচ্চারণ করতেন না। তিনি সর্বদা তাকবীর দিয়ে নামায শুরু করতেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা সবচাইতে ভাল জানেন।

এই ক্ষেত্রেও আমরা যদি হানাফি মাধহাব এর এই রীতিটি না মানি, তাতে কোন সমস্যা নাই।

অনুরূপভাবে প্রত্যেক মাধহাব এর যেসব অনুশাসন, ফাতওয়া, রীতিনীতির সাথে কুর’আন এবং সুন্নাহ এর মিল নাই সেগুলাও বর্জনীয়।

ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়, প্রত্যেক ভিন্ন দল কিংবা অভিমত প্রদানকারী ফিকহ স্কুল –এর মানুষেরাই পরবর্তী পর্যায়ে নিজেরাই তাঁদের স্কুলের শিক্ষা অনুসরণ না করে (হতে পারে পরবর্তী মতটাই অধিকতর সঠিক কিংবা পুরাই বিদ’আহ) অন্যান্য উপদল তৈরি করেন। এই জন্য প্রত্যেক দলেই আপনি এক বা একাধিক উপদল পাবেন।

কিন্তু আমরা যদি দল উপদল নির্বিশেষে কোন একটি দলে থাকতে চাই, সেটা হচ্ছে মুসলিম বা মুসলমানের দল, যেটা আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে দিয়েছেন। একমাত্র কুর’আন এবং হাদীথ-ই শেষ দিন পর্যন্ত অবিকল থাকবে, এবং তা নকল বা বিকৃত হওয়ার কোন ভয় নাই, যেহেতু আল্লাহ্‌ তা’আলা নিজেই এর রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন!

মুসলিমের দল হচ্ছে সেটাই যাঁরা কুর’আন এবং হাদীথকে অনুসরণ করেন। কোন প্রচলিত মতামত, মাধহাব, দল কিংবা অন্য কোন রীতিনীতি যদি সেটা কুর’আন এবং সুন্নাহ পরিপন্থী হয় তবে সেটা প্রত্যাখ্যান করা বাঞ্ছনীয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাউকে যদি সঠিকটা জানিয়ে নতুন কিছু করতে বলা হয়, তারা এটা ভালোভাবে নিতে পারেনা। তারা তাদের যুক্তির পক্ষে কুর’আন কিংবা নির্ভরযোগ্য হাদীথের কোন উল্লেখ করতে না পারলেও তাদের পুরানো বিশ্বাসের প্রতিই অটল থাকে।

আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

“যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তার দিকে ফিরে আসো এবং রসূলের দিকে,‘ তারা বলে, ‘আমাদের জন্য এটাই যথেষ্ট যেটার উপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।‘ অথচ না তারা কিছু জানত, না তারা সঠিক পথে ছিল।“ [৫:১০৪]

ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিৎ যে, আমরা যে মাধহাব বা ফিকহ স্কুল বা নিজেদের যে নামেই (সুন্নি, শিয়া, আহমাদিয়া ইত্যাদি) পরিচিত করিনা কেন, যেসব ক্ষেত্রে মতবিরোধ দেখা দেয় সেসব ক্ষেত্রে আমরা যেন কুর’আন এবং নির্ভরযোগ্য হাদীথ দ্বারা যাচাই করে নেই।

আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখাক, আমীন!

 

References:

  1. http://www.irf.net
  2. http://www.uga.edu/islam/shariah.html#Sunnah
  3. http://www.philtar.ac.uk/encyclopedia/islam/sunni/index.html
Advertisements

আলোচনা

4 thoughts on “চার মাধহাব ও কিছু প্রশ্ন

  1. Thanks for ur nice article. We should respect all the Majhabs & Imams but if is there any contradiction with authentic Holy Quran and Holy Hadith we must have to follow the quran and hadith. Because both of the source are main basement of Islam. Wagajakumulloh.

    Posted by অজ্ঞাত | নভেম্বর 20, 2011, 3:44 অপরাহ্ন
  2. A beautiful post. We want more different topics of the 4 madhab on the light of sahih hadidth and quran so that we can follow rasulullah (SA) regularly and discuss with other to dawah. May ALLAH (SAW) show us the right path and guide us – AMEEN

    Posted by Saeed | নভেম্বর 20, 2011, 7:40 অপরাহ্ন
  3. I wish your success. May Allah help your preaching Islam. I request you that always post authentic books from authentic libraries of Bangladesh, such as, Tawheed Publications, Ahle Hadith Library, Husain Al Madani Library, Hadith Foundation Library Rajshahi etc. Also please never publish books of the writer those are followers of Mazhab instead of Quran and Sahih Hadith.
    Zajakallahu Khairan,

    http://islamicbookbd.wordpress.com/

    Posted by islamicbookbd | সেপ্টেম্বর 7, 2013, 8:04 অপরাহ্ন

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: