//
‘ঈদের নামায (সালাতুল ‘ঈদাইন)

বিষয়বস্তুঃ

  • দুই ‘ইদ এর নামাযের প্রস্তুতি
  • দুই ‘ঈদের খাবার
  • মুসাল্লা বা নামযের স্থান
  • ‘ঈদগাহে যাওয়া এবং আসার ভিন্ন পথ
  • নামাযের সময়
  • সালাতুল ‘ঈদাইনের আধান এবং ইক্বমাহ
  • সালাতুল ‘ঈদাইনের তাকবীর
  • সালাতুল ‘ঈদের আগে ও পরের নামায
  • জাম’আত না পেলে
  • সালাতুল ‘ঈদ এর খুতবাহ
  • ‘ঈদের দিনের বিনোদন, গান শুনা এবং খাবার দাবার
  • ‘ঈদের দিন একে অপরকে অভিনন্দন জানানো
  • ‘ঈদের দিন গুলিতে তাকবিরাত

হিজরত এর পর দুই ‘ঈদের নামাযের আদেশ দেয়া হয়। এটা সুন্নাহ মু’ক্কাদাহ, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সবসময় এটা পালন করেছেন এবং (অসুস্থতা অথবা অন্যান্য কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যতীত) সকল পুরুষ এবং নারীকে ‘ঈদগাহে যেয়ে এই নামায পড়ার আদেশ দিয়েছেন।

দুই ‘ইদ এর নামাযের প্রস্তুতি

দুই ‘ইদ –এর অনুষ্ঠানের জন্য গুসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং সবচাইতে ভাল জামা পড়ে ‘ইদের নামাযের প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। এটা মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় কাজ।

জা’ফার ইবন্‌-মুহাম্মাদ রাদিয়াল্লাহু তা’আল আনহু তাঁর বাবার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক ‘ঈদ এ ইয়েমেনি একটি পোশাক পড়তেন। আশ-শাফ’ই এবং আল-বাগাওয়ি অনুরূপ মত প্রদান করেছেন।

আল-হাসসান আস-সিবত্‌ রাদিয়াল্লাহু তা’আল আনহু বলেছেনঃ আল্লাহ্‌র রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ‘ঈদ এ আমাদেরকে সবচাইতে ভাল জামা, ভাল সুগন্ধি এবং সবচেয়ে ভাল পশু কুরবানি দিতে বলেছেন। এটা আল-হাকিম এর মত এবং এই হাদীথটির ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ইসহাক ইবন্‌ বারযাখ যাকে আল-‘আযদি দুর্বল হিসেবে অভিহিত করেছেন, অন্যদিকে ইবন্‌ হিব্বান বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন।

ইবন্‌ আল-ক্বাইয়িম লিখেছেনঃ “নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ‘ঈদের নামাযের জন্য তাঁর সবচাইতে সুন্দর জামা পড়তেন এবং তাঁর একটি বিশেষ হুল্লা স্যুট ছিল যেটা তিনি দুই ‘ঈদ এবং জুমু’আহ তে পড়তেন।

দুই ‘ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে খাবার

‘ঈদ উল ফিতর এর সালাহ –এ যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া উচিৎ, কিন্তু ‘ঈদ উল আযহা এর ক্ষেত্রে এটা করা উচিৎ না। ‘ঈদ উল ফিতর্‌ এর সুন্নাহ হচ্ছে নামাযে যাওয়ার আগে যে কোন বিজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া। ‘ঈদ উল আযহার ক্ষেত্রে ‘ঈদ এর নামায থেকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিৎ। ফিরে এসে আমাদের কুরবানি করা পশুর মাংস থেকে খাওয়া সুন্নাহ।

আনাস রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিতঃ

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজোড় সংখ্যক খেজুর না খাওয়ার আগে ‘ঈদ উল ফিতর এর নামাযের জন্য বের হতেন না।“ [বুখারি ২.১৫:৭৩, আহমাদ]

বুরাইদাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিতঃ

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু না খেয়ে ‘ঈদ উল ফিতর এর নামাযের জন্য বের হতেন না, এবং ‘ঈদ উল আযহার দিনে তিনি নামায থেকে ফিরে না আসার আগে খেতেন না। [তিরমিধি ৫.৩৮:৫৪২, ইবন্‌ মাজাহ্‌]

ইমাম আহমাদ এর সাথে আরও যোগ করেছেনঃ

এবং তিনি তাঁর কুরবানি করা পশুর মাংস থেকে খেতেন।

সা’ইদ বিন আল-মুসাইয়াব তাঁর আল মুওয়াত্তা গ্রন্থে লিখেছেন যে ‘ঈদ উল ফিতর এর নামযে যাওয়ার আগে সবাইকে কিছু খেয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়া হয়েছে।

ইবন্‌-আল ক্বুদামাহ বলেছেনঃ

সিয়াম ভাঙ্গার দিন অর্থাৎ ‘ঈদ উল ফিতর্‌ এর সকালে নাস্তা করে বের হতে হবে এটা ছাড়া আর কোন মতামত আমার জানা নাই।

নামাযের আগে খাওয়ার কারণ হচ্ছে, কেউ যেন এটা মনে না করে যে ‘ঈদ উল ফিতর এ নামায পড়ার আগে খাওয়া যাবেনা।

মুসাল্লা বা নামাযের স্থান

সালাতুল ‘ঈদ মাসজিদ এ পড়া যায়, তবে বিনা কারণে (বৃষ্টি অথবা অন্যান্য কোন কারণে) ‘ঈদগাহ ছাড়া অন্যত্র এই নামায পড়া ঠিক না, যেহেতু আমাদের নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় মাদিনাহ থেকে দূরবর্তী জায়গায় দুই ‘ঈদ এর নামায পড়তেন এবং তিনি শুধুমাত্র একবার বৃষ্টি হওয়ার কারণে মসজিদে পড়েছিলেন।

আবু হুরাইরাহ্‌ হতে বর্ণিত যে এক ‘ঈদের দিন বৃষ্টি হওয়ার কারণে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদে নামায পড়িয়েছিলেন। [আবু দাউদ, ইবন্‌ মাজাহ্‌, আল-হাকিম]। এই হাদীথটির বর্ণনাকারীগণের মধ্যে একজন অচেনা বর্ণনাকারী রয়েছেন। আল-হাফিজ তাঁর আত-তালখিস এ বলেছেনঃ “এটা দুর্বল,” এবং আয্ব-য্বাহাবি বলেছেনঃ “এটা প্রত্যাখ্যাত।“

‘ঈদগাহে যাওয়া এবং আসার জন্য ভিন্ন পথ

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞগণের মতে নামাযের ইমাম কিংবা জামা’আতের সদস্য যেই হোক না কেন, সকলেরই উচিৎ যে রাস্তা দিয়ে ‘ঈদগাহে যাবেন অন্য আরেকটি পথ দিয়ে বাসায় ফিরা।

জাবির রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিতঃ

‘ঈদের দিন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথে যেতেন, (নামায শেষ করে) অন্য একটি পথে ফিরে আসতেন। [বুখারী ২.১৫:১০২]

আবু হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিতঃ

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পথে সালাতুল ‘ঈদ এ যেতেন, অন্য আরেকটি পথে ফিরে আসতেন। [আত-তিরমধি ৫.৩৭:৫৪১, মুসলিম, আহমাদ]

একই পথে যাওয়া এবং আসাও অনুমোদনযোগ্য। বাকর্‌ ইবন্‌ মুবাশির রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেনঃ

আমি সাহাবিদের সাথে ‘ঈদুল আযহা এবং ‘ঈদুল ফিতর এর নামাযের জন্য ‘ঈদগাহে যেতাম, এবং মাদিনার এক উপত্যকার ভিতর দিয়ে আমরা ‘ঈদগাহে পৌঁছতাম, এবং আমরা রসূলুল্লাহ এর সাথে নামায পড়তাম, এবং আমরা আমাদের বাসায় সেই একই উপত্যকা দিয়ে পৌঁছতাম।

এটা আবু দাউদ, আল-হাকিম এবং আল বুখারি তাঁর তারিখে লিপিবদ্ধ করেছেন। ইবন্‌ আস-সাকিন বলেছেন, এটার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য

নামাযের সময়

সালাতুল ‘ঈদ এর সময় শুরু হয় যখন সূর্য দিগন্ত থেকে প্রায় তিন মিটার উচ্চতায় থাকে এবং মধ্যাহ্ন পর্যন্ত এই নামাযের সময় থাকে।

আহমাদ ইবন্‌ হাসান আল-বানা’ লিখেছেন যে জুন্দুব রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেন,

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ঈদুল ফিতর এর নামায পড়তেন যখন সূর্য দিগন্ত থেকে আনুমানিক ৬ মিটার উপরে থাকত এবং ‘ঈদুল আযহা এর নামায পড়তেন যখন সূর্য দিগন্ত থেকে প্রায় তিন মিটার উচ্চতায় থাকত।

আশ-শাওকানি বলেছেনঃ

সালাতুল ‘ঈদাইন এর সময় সংক্রান্ত এটাই সবচাইতে ভাল মত এবং এই হাদীথের মাধ্যমে এটা বুঝা যায় যে সালাতুল আযহার নামায তাড়াতাড়ি পড়া ভাল এবং সালাতুল ফিতর এর নামায দেরী করে পড়া ভাল।

ইবন্‌ ক্বুদামাহ্‌ বলেছেনঃ

সালাতুল আযহার নামায তাড়াতাড়ি পড়া সুন্নাহ, যাতে করে মানুষজন কুরবানির জন্য বেশী সময় পায়, এবং সালাতুল ফিতর্‌ এর নাময দেরী করে পড়া উচিৎ যাতে করে মানুষজন যাকাত আল-ফিতর্‌ পরিশোধ করার সময় পায়। এটা ছাড়া আর কোন ভিন্নমত আমার জানা নাই।

সালাতুল ‘ঈদাইনের আধান এবং ইক্বমাহ

ইবন আল-ক্বাইয়িম লিখেছেনঃ যখন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসাল্লা (‘ঈদগাহ) এ যেতেন, তিনি কোন আধান অথবা ইক্বমাহ ছাড়া নামায পড়তেন। সুন্নাহ হচ্ছে আধান কিংবা ইক্বামাহ কোনটাই না করা।

ইবন্‌ ‘আব্বাস এবং জাবির রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুম দুজনেই বর্ণনা করেছেন যে ‘ঈদুল ফিতর্‌ কিংবা ‘ঈদুল আযহার নামাযে কোন দিনই আধান কিংবা ইক্বমাহ পড়া হত না। [বুখারী ও মুসলিম] ‘আতা রাদিআল্লাহু তা’আলা তানহু বলেছেনঃ

জাবির আমাকে জানিয়েছেন যে, ‘ঈদুল ফিতর এর নামাযের জন্য ইমাম আসার আগে কিংবা পড়ে কখনই কোন আধান নেই। এবং কোন ইক্বমাহ ও নাই। [মুসলিম ৪:১৯২৭]

সা’দ ইবন্‌ আবি-ওয়াক্বক্বস বলেছেনঃ

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতুল ‘ঈদ এর নামায কোন আধান কিংবা ইক্বমাহ ছারাই পড়তেন। তিনি দাঁড়িয়ে দুইটি খুতবা দিতেন এবং আলাদা করার জন্য দুই খুতবার মাঝখানে বসতেন।

সালাতুল ‘ঈদাইনের তাকবীর

‘ঈদের দুই রাক’আত নামযের সুন্নাহ হচ্ছে সাতবার তাকবীর উচ্চারণ করা, (নামায শুরু করার জন্য) প্রথম তাকবীর এবং প্রথম রাক’আহ –তে কুর’আন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বে। প্রথম রাক’আহ –এর পর তাকবীর দিয়ে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় রাক’আহ তে তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বে পাঁচবার তাকবীর পড়তে হবে। প্রত্যেক তাকবীর উচ্চারনের সময় হাত উঠাতে হবে। ‘উমার রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু এবং তার ছেলে আবদুল্লাহ হতে এরূপ হাদীথ বর্ণিত আছে।

‘আমর ইবন্‌ শু’আইব তাঁর বাবার কাছ থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ঈদের নামাযে ১২বার তাকবীর বলতেন, প্রথম রাক’আহ –তে সাতবার, দ্বিতীয় রাক’আহ –তে পাঁচবার। তিনি ‘ঈদের নামাযের আগে কিংবা পড়ে কোন নামায পড়তেন না। এটা আহমাদ ও ইবন্‌ মাজাহ হতে বর্ণিত। আহমাদ বলেছেনঃ “আমি এটা অনুসরণ করি।“

আবু দাউদ এবং আদ-দারাক্বুতনি বলেছেন যে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছনঃ

‘ঈদুল ফিতর এর তাকবিরাত প্রথম রাক’আহ –তে সাতটি এবং দ্বিতীয় রাক’আহ –তে পাঁচটি, এবং তাকবীর এর পড়ে কুর’আন তিলাওয়াত শুরু হবে।

বিশেষজ্ঞগণের মতে এটা এই ক্ষেত্রে সবচাইতে শক্তিশালী এবং অধিকাংশ সাহাবি এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ইমামদের মতও এটাই। ইবন্‌ আবদুল-বার তাকবিরাত এর সংখ্যা নিয়ে বলেছেন,

অনেক অনেক বিশুদ্ধ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীর ধারাবাহিকতায় এটা এসেছে যে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম রাক’আহ –তে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাক’আহ –তে পাঁচবার তাকবীর বলতেন। ‘আব্দুল্লাহ্‌ ইবন্‌ ‘আমর্‌, ইবন্‌ ‘উমার, জাবির, ‘আইশাহ্‌, আবু ওয়াক্বিদ এবং ‘আমির ইবন্‌ ‘আউফ আল-মাযনি হতেও এরূপ বর্ণনা আছে। নবীজির থেকে এর উপরোক্ত হাদীথগুলোর চেয়ে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় বিশুদ্ধ অথবা দুর্বল কোন হাদীথ নেই যেটা ভিন্ন মত পোষণ করে, এবং এটাই অভ্যাস করতে হবে।

দুই তাকবিরাত এর মাঝখানে থামা প্রসঙ্গে অভিমত হচ্ছে, রসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুক্ষণের জন্য দুই তাকবীর এর মাঝখানে থামতেন। এর মাঝখানে তিনি কিছু বলতেন কিনা এ সম্পর্কিত কোন হাদীথ পাওয়া যায় না। যদিও আত-তাবারানি এবং আল-বাইহাই বলেছেন যে, ইবন্‌ মাস’উদ দুই তাকবীর এর মাঝখানে আল্লাহ্‌র প্রশংসা করতেন এবং নবীজির জন্য দু’আ করতেন। হাদীথটির বর্ণনার ধারাবাহিকতা নির্ভরযোগ্য। হুধাইফাহ্‌ এবং আবু মুসা থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। নামাযে তাকবিরাত(‘ঈদের নামাযের ১২তাকবির) উচ্চারণ করা সুন্নাহ যদিও ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা ভুলবশত কেউ না পড়লে নামায নষ্ট হবেনা।

ইবন্‌ ক্বুদামাহ বলেছেনঃ

এই ক্ষেত্রে এটা ছাড়া অন্য কোন মত আমার জানা নাই।

আশ-শাওকানি বলেছেন যে, সবচাইতে গ্রহণযোগ্য মতামত হচ্ছে যদি কেউ ভুল বশত তাকবিরাত না পড়ে থাকে তাহলে তাকে সিজদাহ সাহু করতে হবেনা।

সালাতুল ‘ঈদের আগে ও পরের নামায

‘ঈদের নামাযের আগে কিংবা পরে কোন সুন্নাহ নামায এর কোন কথা আমাদের জানা নাই। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণের কেউ কখনো মুসাল্লা (‘ঈদগাহ) –তে পৌঁছে কোন নামায পড়েন নি।

ইবন্‌ ‘আব্বাস বর্ণনা করেছেনঃ

রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ঈদগাহে যেয়ে দুই রাক’আত নামায পড়েছেন, এর আগে কিংবা পরে কোন নামায পড়েননি। বুখারি ও মুসলিম হাদীথ গ্রন্থে এর বর্ণনা আছে।

ইবন্‌ ‘উমার রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু এরূপ করতেন এবং তিনি বলেছেন এটাই নবীজির রীতি।

আল-বুখারি লিখেছেন যে ইবন্‌ ‘আব্বাস এটা অপছন্দ করতেন যখন কেউ সালাতুল ‘ঈদ এর আগে ও পরে কোন নামায পড়ে। এই সময়ে নাফল নামায নিয়ে বলা হয়েছে যে, ইবন হাজার তাঁর ফাথ আল-বারি গ্রন্থে বলেছেন যে, এই সংক্রান্ত কোন প্রমাণাদি নেই যে এটা অনুমিত নয়। যে সময়গুলাতে নামায পড়া নিষিদ্ধ সেই সময়গুলা ব্যাতিত যে কোন সময় নাফল নামায পড়া যাবে।

জাম’আত না পেলে

সহীহ আল-বুখারিতে আমরা পাই যে,

যদি কেউ সালাতুল ‘ঈদ এর নামায জাম’আতে না পায়, সে আলাদা ভাবে দুই রাক’আত নামায পড়ে নিবে। নারী এবং যারা (ঈদগাহ বা মাসজিদ থেকে) অনেক দূরবর্তী জায়গায় থাকে তাদের জন্যও একই নিয়ম।

আনাস ইবন্‌ মালিক রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু ইবন্‌ আবি-‘উতবাহ যিনি দূরবর্তী স্থানে থাকতেন, তাকে আদেশ দিয়েছিলেন যে তার পরিবার ও বাচ্চাকে একত্রিত করে ‘ঈদের নামায পড়তে, ঠিক যেমন শহরের মানুষজন যেভাবে তাকবিরাতের সাথে পড়তেন, ওভাবে।

‘ইক্‌রিমাহ্‌ বলেছেনঃ

ইমাম যেভাবে পড়ে দেশের সকল মানুষ একত্রে জড়ো হয়ে ‘ঈদের দুই রাক’আত নামায পড়বে।

‘আতা বলেছেনঃ

যদি কেউ জাম’আত না পায় তাহলে সে দুই রাক’আত পড়ে নিবে।

সালাতুল ‘ঈদ এর খুতবাহ্‌

সালাতুল ‘ঈদ এর খুতবাহ পড়া এবং শুনা দুটাই সুন্নাহ। জুম’আহ এর খুতবাহ এর সাথে সালাতুল ‘ঈদের খুতবাহ এর পার্থক্য হচ্ছে, জুম’আহ এর খুতবাহ নামাযের আগে দেয়া হয় এবং ‘ঈদের নামাযের খুতবাহ নামাযের পরে দেয়া হয়।

আবু সা’ইদ বলেছেন

‘ঈদুল ফিতর্‌ এবং ‘ঈদুল আযহায় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদগাহে যেতেন, নামায পড়তেন, এবং যখন নামায শেষ করতেন, তিনি সারিবদ্ধ জনসমাগম এর দিকে ফিরতেন এবং তাদের সতর্ক করতেন, উপদেশ দিতেন এবং (ভাল কাজ করার) পরামর্শ দিতেন।
সর্বত্র মানুষ এটাই অনুসরণ করত, কিন্তু একবার আমি মাদিনার তৎকালীন গভর্নর মারওয়ান এর সাথে ‘ঈদের নামায পড়তে যাই। যখন আমি ‘ঈদগাহে পৌঁছলাম, আমি কাথির ইবন্‌ আস-সালত এর বানানো একটি মিনবার দেখতে পেলাম। যখন মারওয়ান নামায পড়ার আগেই ওখানে উঠতে লাগল, আমি তার জামা টেনে ধরলাম। সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নামাযের আগেই খুতবাহ দিল। আমি তাকে বললামঃ ‘আল্লাহ্‌র শপথ, তুমি এটা পরিবর্তন করেছ।‘ সে বললঃ ‘ও আবু সা’ইদ…সেই দিন আর নাই যা তুমি জানতে।‘ আমি বললামঃ ‘আল্লাহ্‌র শপথ আমি যা জানিনা তার চেয়ে যা জানি সেটা অনেক ভাল।‘ সে বললঃ ‘নামাযের পরে খুতবাহ দিলে মানুষজন থাকবেনা, তাই আমি নামাযের আগে খুতবাহ দিয়েছি। [বুখারি ও মুসলিম]

‘ঈদের দিনের বিনোদন, গান শুনা

চিত্ত বিনোদন, গান গাওয়া এবং শুনা সেটা যদি নৈতিকতার সীমার মধ্যে হয়, তাহলে সেটা ‘ঈদের দিনগুলিতে অনুমোদিত।

আ’ইশাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিতঃ

কিছু আবিসিনিয়ান ‘ঈদের দিন এসে হাতের খেলা দেখাচ্ছিল। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডাকলেন (খেলা দেখার জন্য)। আমি আমার মাথা তাঁর কাঁধের উপর রেখে তাদের খেলা দেখতে লাগলাম এবং সন্তুষ্ট হওয়ার পর চলে আসলাম। [মুসলিম ৪:১৯৪৩, বুখারি, আহমাদ]

আ’ইশা রাদিআল্লাহু তা’আলা হতে বর্ণিতঃ

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ঈদের দিনে আমার ঘরে আসলেন, যখন দুটি মেয়ে (আন্‌সার, খারায এবং আউস এর যুদ্ধের বর্ণনা নিয়ে) গান গাচ্ছিল। নবীজি বিছানায় শুয়ে পরলেন, এবং অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। একটু পর আবু বাকর্‌ ঢুকলেন এবং জোর গলায় বললেনঃ ‘শয়তান এর বাদ্য তাও আবার আল্লাহ্‌র রসূল এর সামনে!’ নবীজি তাঁর দিকে ফিরে বললেনঃ ‘বাদ দিন।‘ যখন আবু বাকর্‌ অমনোযোগী হয়ে পরলেন আমি মেয়েদের চলে যেতে বললাম। এটা ‘ঈদের দিন ছিল। এবং আফ্রিকানরা তাদের ঢাল এবং বর্শা দিয়ে খেলছিল। (এটা আমি মনে করতে পারছিনা যে) আমি তাদের দেকেছিলাম নাকি নবীজি আমার পছন্দ হবে এই জন্য দেখতে বলেছিলেন কিনা। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েছিলাম। নবীজি আমাকে তাঁর পিছে দাঁড় করালেন এবং গাল তার পিছনে ছিল। তিনি বলেছিলেনঃ ‘ও আফ্রাদাহ গোষ্ঠী শুরু করো।‘ যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘এটা কি তোমার জন্য যথেষ্ট?’ আমি উত্তরে বললামঃ ‘জী হ্যাঁ।‘ তিনি তারপর বললেনঃ ‘তাহলে চলে আস।‘ [বুখারি ২.১৫:৭০, মুসলিম, আহমাদ]

ইবন্‌ হাজার তাঁর ফাথ আল-বারিতে লিখেছেন যে, “ইবন্‌ আস-সিরাজ আবু আয-যিনাদ থেকে, উরওয়াহ –এর নির্ভরতায় ‘আইশাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা হতে বর্ণনা করেছেন যে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দিনে বলেছেনঃ

মাদিনার জিউস(ইহুদিদের) জানতে দাও যে, আমাদের জীবনবিধান অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত (এবং এখানে বিনোদনের জায়গা রয়েছে) এবং আমাকে সহজ সাবলীল এবং সহজবোধ্য জীবনবিধান দিয়ে পাঠানো হয়েছে।

‘ঈদের দিন একে অপরকে অভিনন্দন জানানো

‘ঈদের দিনে একে অপরকে অভিনন্দন জানানো খুবই প্রশংসনীয়।

জাবির ইবন্‌ নাফির বলেছেনঃ

যখন সাহাবিগণ ‘ঈদের দিন একে অপরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন তখন বলতেন, ‘তাক্বব্বাল মিন্না ওয়া মিনকা -তোমাদের এবং আমাদের থেকে (আল্লাহ্‌) এটা গ্রহণ করুক’। ইবন হাজার বলেছেন এটার বর্ণনাকারীগণ উত্তম।

‘ঈদের দিনগুলিতে তাকবিরাত

‘ঈদের দিনগুলিতে তাকবিরাত বলা সুন্নাহ।

আল্লাহ্‌ তা’আলা কুর’আনে বলেছেন,

(সিয়াম পালনের) নির্দিষ্ট সময় পরিপূর্ণ কর এবং তোমাদেরকে পথপ্রদর্শন করার জন্য আল্লাহ্‌র গুণকীর্তন কর [অর্থাৎ তাকবীর বল], যাতে করে তোমরা ধন্যবাদ দিতে পার। [২:১৮৫]

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞগণের মতে ‘ঈদুল ফিতর্‌ এর তাকবীরের সময় হচ্ছে, যখন কেউ ‘ঈদগাহে যাওয়া শুরু করে তখন থেকে খুতবাহ শুরু হওয়া পর্যন্ত। এ সংক্রান্ত কিছু দুর্বল হাদীথ এর বর্ণনা পাওয়া যায়, কিন্তু কিছু নির্ভরযোগ্য হাদীথও পাওয়া যায়, যেখান থেকে এটা দেখা যায় যে, ইবন্‌ ‘উমার এবং অন্যান্য সাহাবিগণ এমনটা করতেন। আল-হাকিম বলেছেনঃ “এই সুন্নাহ আহল-ইল-হাদীথ, মালিক, আহমাদ, ইসহাক্ব এবং আবু থাউর কর্তৃক পালন করা হত।“

কারো কারো মতে তাকবিরাত এর সময়সীমা হচ্ছে, যখন চাঁদ দেখা যায় তখন থেকে, এবং যতক্ষণ না কেউ ‘ঈদগাহে যায় এবং ইমাম আসে ততক্ষণ পর্যন্ত। (‘ঈদুল আযহার তাকবিরাত সম্পর্কিত হাদীথ এবং মতামত পরে অনুবাদ করা হবে।)

তাকবিরাত বিভিন্নভাবে বলা যায়। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুটি তাকবীর হচ্ছেঃ

১. ‘আব্দুর্‌ রাজ্জাক, সালমান রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুম থেকে বর্ণনা করেছেনঃ তাঁরা এভাবে তাকবীর বলতঃ ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, কাবীরা’

২. ‘উমার এবং ইবন্‌ মাস’উদ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুম বলেছেনঃ ‘আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল-হামদ।‘

অর্থঃ আল্লাহ্‌ সবচাইতে মহান, আল্লাহ্‌ সবচাইতে মহান। আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আল্লাহ্‌ সবচাইতে মহান, আল্লাহ্‌ সবচাইতে মহান। সকল প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহ্‌র জন্য।

 

মূলঃ ফিকহ্‌ আস সুন্নাহ
লেখকঃ সাইয়িদ সাবিক্ব

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: