//
আইয়াত ৬০

৬০. আর (স্মরণ করো) যখন মূসা (মোসেস) তার ছোকরা-চাকরকে বললঃ “যতক্ষণ না আমি দুই সাগরের মিলনস্থলে পৌঁছব, ততক্ষণ আমি (এই যাত্রা থেকে) হাল ছাড়ব না অথবা (যতক্ষণ না) আমি বছরের পর বছর এই ভ্রমণে অতিবাহিত করছি। [১]


মূসা (মোসেস্‌) ও খিদ্বরের (আলাইহিস্‌সালাম) কাহিনীঃ সা’ঈদ ইবনু যুবাইর বর্ণনা করেছেনঃ আমি ইবনু ‘আব্বাসকে বললাম, নাওফ আল-বিকালির ধারণা আল-খিদ্বরের সাথী মূসা (মোসেস্‌), তিনি ইস্রইলের বংশধরের নাবী মূসা (মোসেস্‌) ছিলেন না। ইবনু ‘আব্বাস বললেন, “আল্লাহর শত্রু (নাওফ) মিথ্যা কথা বলেছে।” উবাই ইবনু কা’আব আমাকে বলেছেন, তিনি আল্লাহর বার্তাবাহক صلى الله عليه وسلم –কে বলতে শুনেছেন, মূসা (মোসেস্‌) একবার ইস্রঈলের বংশধরদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাকে প্রশ্ন করা হল, ‘কোন ব্যক্তি সবচেয়ে জ্ঞানী?’ তিনি বললেন, ‘আমি।’ এতে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হলেন। কেননা এ জ্ঞানের ব্যাপারটিকে তিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন নি। আল্লাহ তার প্রতি প্রত্যাদেশ করলেন, দুই সাগরের সংযোগস্থলে আমার এক দাস রয়েছে, সে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘হে প্রভু আমী কীভাবে তার সাক্ষাৎ পেতে পারি?’ আল্লাহ বললেন, ‘তোমার সঙ্গে একটি মাছ নাও এবং সেটা ব্যাগের মধ্যে রাখ, যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে সেখানেই (সেই জায়গা)। তারপর তিনি একটি মাছ নিলেন এবং সেটাকে থলের মধ্যে রাখলেন। তারপর রওনা দিলেন। আর সঙ্গে চললেন ‘ইউশা’ ইবনু নূন। তারা যখন সাগরের ধারে একটি বড় শিলাখণ্ডের কাছে এসে হাজির হলেন, তখন তারা উভয়েই তার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলের ভেতর লাফিয়ে উঠল এবং থলে থেকে বের হয়ে সাগরে চলে গেল। আর এটি সুড়ঙ্গের মত পথ করে সাগরে নেমে গেল। (১৮:৬১) আর মাছটি যেখান দিয়ে চলে গিয়েছিল, আল্লাহ সেখান থেকে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিলেন এবং সেখানে একটি সুড়ঙ্গের মত পথ হয়ে গেল। যখন তিনি জেগে উঠলেন, তার সাথী তাকে মাছটির সংবাদ দিতে ভুলে গিয়েছিল। সেদিনের বাকী সময় ও পরবর্তী রাত তারা পথ চললেন। যখন ভোর হল, মূসা (মোসেস্‌) তার চাকরকে বললেন, “আমাদের সকালের নাস্তা নিয়ে এসো; নিশ্চয় আমরা আমাদের এই ভ্রমণে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।” (১৮:৬২)

আল্লাহ যে স্থানের নির্দেশ করেছিলেন, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে মূসা (মোসেস্‌) ক্লান্ত হন নি। তার ছোকরা-চাকর তখন তাকে বলল, “আপনার কি মনে পড়ে যখন আমরা শিলাখণ্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম? আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, শয়তান আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। এটি আশ্চর্যজনকভাবে সাগরে নিজের পথ করে নিয়েছিল!” (১৮:৬৩)

মাছটি তার পথ করে সাগরে নেমে গিয়েছিল এবং মূসা (মোসেস্‌) ও তার ছোকরা-চাকরকে তা আশ্চার্যান্বিত করে দিয়েছিল। মূসা (মোসেস্‌) বললেন, “আমরা তো এই(জায়গা)টাই খুঁজছিলাম।” সুতরাং তারা নিজেদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চলল। (১৮:৬৪) তারা উভয়ে তাদের পদচিহ্ন ধরে সেই শিলাখণ্ডের কাছে ফিরে আসলেন সেখানে এক ব্যক্তিকে কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় পেলেন মূসা (মোসেস্‌) তাকে অভিবাদন জানালেন আল-খিদ্বর আশ্চার্যান্বিত হয়ে বললেন, ‘তোমাদের জায়গায় এভাবে অভিবাদন জানানো হয়?’ মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘আমি মূসা (মোসেস্‌) তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইস্রঈল বংশধরের মূসা (মোসেস্‌)?’ মূসা (মোসেস্‌) উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ’; এবং বললেন, ‘আমি আপনার কাছে এসেছি, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন, এজন্যে।’

আল-খিদ্বর বললেন, ‘আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না।’ (১৮:৬৭)

হে মূসা! আল্লাহর জ্ঞান থেকে আমাকে এমন কিছু জ্ঞান দান করা হয়েছে যা আপনি জানেন না আর আপনাকে আল্লাহ তাঁর জ্ঞান থেকে যে জ্ঞান দান করেছেন, তা আমি জানি না। মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তাহলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন, আর আমি কোন বিষয়ে আপনাকে অমান্য করব না।’ (১৮:৬৯)

আল-খিদ্বর তাকে বললেন, ‘তবে আপনি যদি আমাকে অনুসরণ করেন, তাহলে কোন বিষয় সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না আমি সে সম্পর্কে আপনাকে জানাই।’ (১৮:৭০) তারপর উভয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁরা সাগরের পাড় ধরে চলতে লাগলেন। তখন একটি জলযান যাচ্ছিল। তাঁরা তাদের জলযানে উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে জলযানের চালকদের সাথে আলাপ করলেন। তারা আল-খিদ্বরকে চিনে ফেলল। তাই তাদেরকে বিনা ভাড়ায় উঠিয়ে নিল। যখন তারা জলযানে উঠলেন মূসা (মোসেস্‌) হঠাৎ দেখলেন আল-খিদ্বর কুড়াল দিয়ে জলযানটি ছিদ্র করে দিলেন। মূসা (মোসেস্‌) তাকে বললেন, ‘এ লোকেরা বিনা ভাড়ায় আমাদের নিয়ে যাচ্ছে, অথচ আপনি জলযানটি নষ্ট করে দিলেন। আপনি কি এর মানুষ ডোবানোর জন্য একে ফুটো করে দিলেন? নিশ্চয় আপনি একটি ইম্‌র (মুনকার — মন্দ, খারাপ, ভয়ঙ্কর) কাজ করেছেন।’ (১৮:৭১)

আল-খিদ্বর বললেন, ‘আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না?’ (১৮:৭২)

মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘আমি যা ভুলে গিয়েছি, সে ব্যাপারে আমাকে ধরবেন না এবং আমার বিষয়ে (আপনি) কঠোর হবেন না।’ (১৮:৭৩)

আল্লাহর বার্তাবহক صلى الله عليه وسلم বললেন, “মূসা (মোসেস্‌) প্রথম যে অজুহাতটি দিয়েছিলেন তা হচ্ছে যে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। এরপরে একটি চড়ুই পাখি এসে জলযানের পাশে বসে ঠোঁট দিয়ে সাগরে এক ঠোকর মারল। আল-খিদ্বর মূসা (মোসেস্‌)কে বললেন, এ সাগর হতে চড়ুই পাখিটি যতটুকু পানি ঠোঁটে নিল, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় ততটুকু। তারপর তাঁরা জলযান থেকে নেমে সাগরের পাড় ধরে চলতে লাগলেন। এমতাবস্থায় আল-খিদ্বর একটি বালককে অন্য বালকদের সঙ্গে খেলতে দেখলেন। আল-খিদ্বর হাত দিয়ে ছেলেটির মাথা ধরে তাকে মেরে ফেললেন। মূসা (মোসেস্‌) আল-খিদ্বরকে বললেন, ‘আপনি কি এমন এক নির্দোষ ব্যক্তিকে হত্যা করলেন যে কাউকেই হত্যা করে নি? নিশ্চয় আপনি একটি নুক্‌র (মুনকার — নিষিদ্ধ, মন্দ, ভয়ঙ্কর) কাজ করেছেন!’ তিনি বললেন, ‘আমি কি আপনাকে বলি নি যে, আপনি কখনই আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না?’ (১৮:৭৫) নাবী صلى الله عليه وسلم বললেন, এ অভিযোগটি ছিল প্রথমটির অপেক্ষাও মারাত্মক। মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘যদি আমি এরপর আপনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করি, আমাকে আপনার সাথে আর রাখবেন না, আমার পক্ষ থেকে আপনি একটি অজুহাত পেয়ে গেলেন।’ (১৮:৭৬)

তারপর তারা উভয়ে চলতে লাগলেন। শেষে তারা এক শহরের কাছে পৌছলেন। তারা এর লোকজনদের কাছে খাদ্য চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকৃত জানাল। তারপর সেখানে তারা এক প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেটি ঝুঁকে পড়েছিল। আল-খিদ্বর নিজ হাতে সেটি সোজা করে দিলেন। মূসা (মোসেস্‌) বললেন, ‘এ লোকদের কাছে আমরা এলাম, তারা আমাদের খাদ্য দিল না এবং আমাদের আতিথেয়তাও করল না। আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। (আল-খিদ্বর) বললেন, ‘এখানেই আপনার আর আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল, (দেখুন পংক্তি নং ১৮:৭৯-৮২) এগুলোই হচ্ছে সেসব জিনিসের ব্যাখ্যা যেসব (জিনিসের) ব্যাপারে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেন নি।’ (১৮:৭৮-৮২)”

আল্লাহর বার্তাবাহক صلى الله عليه وسلم বললেন, “আমার মনের বাসনা যে, যদি মূসা (মোসেস্‌) আর একটু ধৈর্য ধারণ করতেন, তাহলে আল্লাহ তাঁদের আরও ঘটনা আমাদের জানাতেন।” [সহীহ বুখারী, গ্রন্থ ৬৫: আল-ক্বুর’আনের তাফসীর, হাদীস নং-৪৭২৫]

<< পূর্বের পৃষ্ঠা ——— পৃষ্ঠা ৬/১২ ——— পরবর্তী পৃষ্ঠা >>

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: