//
১. সূরাত আল-ফাতিহাহ [প্রারম্ভ]

১. সর্বাপেক্ষা দয়াময়, সর্বাপেক্ষা দয়ালু আল্লাহর নামে। [১]

২. সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা ‘আলামিন [মানবজাতি, জিনজাতি, মহাকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছু]-এর প্রভু [২] আল্লাহর জন্য। [৩]

৩. সর্বাপেক্ষা দয়াময়, সর্বাপেক্ষা দয়ালু।

৪. বিচার দিন [অর্থাৎ পুনরুত্থানের দিন]-এর একমাত্র মালিক [এবং একমাত্র বিচারক]।

৫. আমরা [শুধু] আপনারই উপাসনা করি, এবং [শুধু] আপনার কাছেই আমরা [সবকিছুর জন্য] সাহায্য চাই।

৬. আমাদেরকে সরল পথের দিকনির্দেশনা দিন।[৪]

৭. তাদের পথে যাদেরকে আপনি অনুগ্রহ দান করেছেন,[৫] তাদের [পথে] নয় যারা আপনার রোষে পতিত হয়েছে[৬] [অর্থাৎ ইয়াহূদী] এবং তাদের [পথও] নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে [অর্থাৎ খ্রিস্টান]।[৭] [৮] [৯]



“ফাতিহা” (ফাতিহা অর্থঃ সূচনা, ভূমিকা ও সূত্রপাত করা।) এ সূরাটিকে ফাতিহাতুল কিতাব ও উম্মুল কিতাবও বলা হয়। কারণ, মুসহাফের (কুর’আন মাজীদ) প্রথমে এ সূরাটি লিখিত এবং সলাতের মধ্যে এর দ্বারাই কির’আত আরম্ভ করা হয় বলে একে এ নামে অভিহিত করা হয়েছে। (বুখারী কিতাবুত তাফসীর, ফাতিহাতুল কিতাব অনুচ্ছেদ।)

 [১:২] কুর’আনে এখানে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হচ্ছে রব্ব। বাংলা ভাষায় এই শব্দটির সমার্থক কোন শব্দ নেই। এর অনেকগুলো অর্থ হয়, যেমন, সকল মহাবিশ্বের একজন প্রভু, এর সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক, সংগঠনকারী, প্রতিদানকারী, মালিক, পরিকল্পনাগ্রহণকারী, লালনপালনকারী, জীবনদানকারী এবং নিরাপত্তা প্রদানকারী। রব্ব আল্লাহ তা’আলার একটি গুণবাচক নাম। আমরা এখানে এর কাছাকাছি অর্থ হিসেবে ‘প্রভু’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। কুর’আনুল কারীমের অর্থের ব্যাখ্যার সর্বত্র যেখানে ‘প্রভু’ শব্দটি এসেছে এর আসল মানে হচ্ছে ‘রব্ব’ এবং এভাবেই এটি বুঝতে হবে।

[১:২] আবূ সাঈদ ইবনুল মু’আল্লা (রদি’আল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ (একদিন) আমি মাসজিদ নববীতে (নাফিল) সলাত আদায় করছিলাম। ঠিক এ সময়ে রসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে ডাকলেন; কিন্তু আমি তাঁকে কোন জবাব দিলাম না। পরে গিয়ে আমি তাঁকে বললাম,’হে আল্লাহর রসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! [আপনি যে সময় আমাকে ডেকেছিলেন] আমি তখন সলাত আদায় করছিলাম। রসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একথা শুনে আমাকে বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা কী বলেননি, (অর্থের ব্যাখ্যা), “আল্লাহ এবং রসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আহ্বানে সাড়া দাও, যখন তোমাদেরকে কোন কাজের প্রতি আহ্বান করেন।” (৮:২৪) তারপর আমাকে বললেন, ‘তুমি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে আমি তোমাকে কুর’আনের এমন একটি সূরা শিখিয়ে দিব যা গুরুত্বের দিক দিয়ে সবচাইতে বড়। তারপর তিনি আমার হাত চেপে ধরলেন। যখন তিনি মাসজিদ থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘আপনি কি বলেননি যে, কুর’আনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সূরা আমাকে শিখিয়ে দিবেন?’ তিনি বললেন, ‘সেই সূরাটি হল আলহামদুলিল্লা-হি রব্বিল ‘আলামীন। আমাকে ‘সাবউল মাসানী’ বা বার বার পঠিত এ সাতটি আয়াত ও মহান কুর’আন দান করা হয়েছে। [সহীহ বুখারী, গ্রন্থ ৬৫: আল-ক্বুর’আনের তাফসীর, হাদীস নং-৪৪৭৪]


[১:৬] হিদায়াত দুই ধরণেরঃ

i) তাওফীক প্রদান করার হিদায়াত যা সম্পূর্ণ আল্লাহর তরফ থেকে, অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের মনকে খুলে দেন (অবিশ্বাস থেকে ইসলামিক একেশ্বরবাদে বিশ্বাস) এই সত্য গ্রহণ করার জন্য।

ii) ইরশাদ করার হিদায়াত যে সত্য অর্থাৎ ইসলামিক একেশ্বরবাদ আল্লাহর নাবী-রসূলগণ এবং অন্যান্য ধর্মপ্রচারকগণ প্রচার করে থাকেন।


[১:৭] অর্থাৎ সকল নাবী, সিদ্দিক্বুন (অর্থাৎ নাবীদের সে সকল অনুসারীগণ যারা সর্বপ্রথম নাবীদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন, যেমন আবূ বাক্‌র আস-সিদ্দিক্ব), সকল শাহীদ এবং যারা ন্যায়পরায়ণ ছিলেন তাদের পথ। আল্লাহ তা’আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা), “আর যে কেউ আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হয়, তবে তারা ঐ সকল ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নাবীগণ, সিদ্দিক্বীন, শাহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী” (৪:৬৯)

[১:৭] আ’দি বিন হাতেম (রদি’আল্লাহু আনহু) নাবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “মাগদূবি ‘আলাইহিম দ্বারা ইয়াহূদী সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। (যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আমল পরিত্যাগ করেছে।) আর দল্লীন দ্বারা খ্রিস্টানদের বুঝানো হয়েছে। (যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞান নেই।) [তিরমিযী ও আবূ দাঊদ]


[১:৭] যাইদ বিন আমার বিন নুফাইলের কাহিনী।

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রদি’আল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নাবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হবার পূর্বে বালদাহ নামক স্থানের নিম্নভাগে যাইদ ইবনু আমার বিন নুফাইলের সাথে নাবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাক্ষাৎ হয়। তারপর (কুরাইশদের পক্ষ থেকে) নাবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে খাবার রাখা হলো। তিনি তা খেতে অস্বীকার করলেন (এবং যাইদের সামনে ঠেলে দিলেন; কিন্ত তিনিও তা খেতে অস্বীকার করলেন।) অতঃপর যাইদ তাদের বললেন, নুসুবের* উপর তোমাদের মূর্তির নামে তোমরা যা যবেহ কর তা আমি কিছুতেই খেতে পারিনা। আমি তো কেবলমাত্র তাই খেয়ে থাকি যাতে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়। যাইদ ইবনু ‘আমার কুরাইশদের যবেহর নিন্দা করতেন এবং তাদের উক্ত আচরণের প্রতিবাদ ও তার ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করে বলতেন, বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ এবং তিনি তাঁর আকাশ থেকে পানি বর্ষন করেন, তিনিই তার জন্য মাটি থেকে ঘাস ও লতা-পাতা উৎপন্ন করেন। এতো কিছুর পরও তোমরা তাকে গইরুল্লাহর নামে যবেহ কর। [সহীহ আল-বুখারী, গ্রন্থ ৬৩: আনসারদের মর্যাদা, হাদীস নং-৩৮২৬]

*নুসুবঃ আন-নুসুব হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট জায়গা অথবা কবরের উপরের পাথর সরানো ইত্যাদি। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠান কিংবা মৌসুমে বিভিন্ন মূর্তি, জিন, ফিরিশতা, পীর, সাধু ব্যক্তিকে সম্মান দেখানোর জন্য অথবা তাদের কাছ থেকে কোন উপকার পাওয়ার আশায় পশু যবেহ করা হত।


ইবনু উমার (রদি’আল্লাহু আনহু) বর্ণিত, যাইদ ইবনু আমার ইবনু নুফাইল সত্য দ্বীন সম্পর্কে জানা ও তার অনুসরণ করার জন্য শাম (সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্দানের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল) দেশে গিয়ে এক ইয়াহূদী আলিমের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে তাদের দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বললেন, আমি আপনাদের দ্বীন গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, সুতরাং আমাকে (আপনাদের দ্বীন সম্পর্কে) কিছু বলুন। ইয়াহূদী আলিম বললেন, আপনি আমাদের ধর্মের অনুসারী হতে পারবেন না যে পর্যন্ত আল্লাহর আযাব থেকে আপনার অংশ আপনি গ্রহণ না করেন। যাইদ বললেন, ‘আমি তো আল্লাহর আযাব থেকে (বাঁচার জন্যই ভয়ে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহ পাকের আযাব বিন্দুমাত্রও সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই এবং তা বরদাস্ত করার সাধ্যও রাখিনা। আপনি কি আমাকে অন্য কোন ধর্মের ব্যাপারে বলতে পারেন? ইয়াহূদী আলিম বললেন, ‘দ্বীন-ই-হানিফ (ইসলামিক একেশ্বরবাদ) ছাড়া অন্য কোন সত্য ধর্ম আমার জানা নেই। যাইদ বললেন, ‘দ্বীন-ই-হানিফ কি?’ তিনি বললেন, তাহল ইবরহীম (আলাইহিসসালাম) এর আনীত দ্বীন। তিনি ইয়াহূদী কিংবা খ্রিস্টান ছিলেন না। তিনি একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদাত করতেন না। সেখান থেকে বের হয়ে যাইদ একজন খ্রিস্টান আলিমের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকেও পূর্বের ন্যায় জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, যে পর্যন্ত আপনি আল্লাহর অভিশাপের অংশ গ্রহণ না করবেন সে পর্যন্ত আমাদের ধর্মের অনুসারী হতে পারবেন না। যাইদ বললেন, আল্লাহর অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আল্লাহ পাকের আযাব বিন্দুমাত্রও সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই এবং তা বরদাস্ত করার সাধ্যও রাখিনা। সেক্ষেত্রে আপনি কি আমাকে অন্য কোন ধর্মের ব্যাপারে বলতে পারেন? উত্তরে তিনি বললেন, অন্য কোন ধর্মের কথা আমি জানি না, তবে হানিফ ব্যতীত। যাইদ জিজ্ঞাসা করলেন হানিফ কি? তিনি বললেন, তাহল ইবরহীম (আলাইহিস্‌সালাম)-এর আনীত দীন। তিনি ইয়াহূদীও ছিলেন না, খ্রিস্টানও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদাত করতেন না। যাইদ যখন দেখলেন যে ইবরহীম (আলাইহিস্‌সালাম) এর দ্বীনের সত্যতার ব্যাপারে তারা সকলেই একমত, তাদের মন্তব্য শুনে বাহিরে এসে দু’হাত তুলে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমাকে সাক্ষি রেখে বলছি যে, নিশ্চয়ই আমি ইবরাহীম (আলাইহিস্‌সালাম)-এর দ্বীনের প্রতি রয়েছি।

আসমা বিন্তু আবূ বাকর হতে বর্ণিত, ‘একদিন আমি যাইদ বিন আমার ইবনু নুফাইলকে দেখলাম যে, তিনি কা’বা ঘরের সাথে নিজের পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে বলছেন, হে কুরাইশ দল! আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া তোমাদের কেউ ইবরাহীম (আলাইহিস্‌সালাম)-এর দ্বীনের অনুসারী নয়। তিনি জীবন্ত কবর দেয়া শিশুকন্যাদের নিজের কাছে নিয়ে রাখতেন। যখন কোন ব্যক্তি তার মেয়েকে হত্যা করতে চাইত তখন তিনি তাকে বলতেন, একে হত্যা করো না। তোমার পরিবর্তে আমি তার ভরণ-পোষণের ভার নিব। এ বলে তিনি তাকে নিয়ে যেতেন। মেয়েটা যখন বড় হতো, তিনি তার পিতাকে বলতেন, তুমি চাইলে মেয়েটাকে তোমাকে দিয়ে দিব। আর তুমি যদি চাও তবে আমিই মেয়েটার ভরণ-পোষণ করে যাব। [সহীহ বুখারী, গ্রন্থ ৬৩: আনসারদের মর্যাদা, হাদীস নং- ৩৮২৭, ৩৮২৮]

 [১:৭] উবাদা বিন সামিত (রদি’আল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সলাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করবেনা তার সলাতই হবে না [সহীহ বুখারী, গ্রন্থ ১০: আযান, হাদীস নং-৭৫৬]

 [১:৭] আবূ হরইরহ (রদি’আল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন ইমাম আমীন বলে তখন তোমরাও আমীন বল। কেননা (ঐ সময়) ফিরিশতারাও আমীন বলে থাকে। যে ব্যক্তির আমীন বলা মালা’ইকাহ (ফেরেশ্তা)দের আমীন বলার সাথে মিলে যায় তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (আমীন অর্থ হচ্ছে “হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন।”) [সহীহ বুখারী, গ্রন্থ ৬৫: আল-ক্বুর’আনের তাফসীর, হাদীস নং-৪৪৭৫]

আলোচনা

One thought on “১. সূরাত আল-ফাতিহাহ [প্রারম্ভ]

  1. বই আকারে করে ওয়েব সাইট এই চেরে দিলে শুবিদা হবে ডাউনলোড করে
    সেভ করে রাখা যাই

    Posted by আলমগির | ডিসেম্বর 21, 2012, 9:12 অপরাহ্ন

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: