//
বিশ্বাসীরা পথনির্দেশ বারবার প্রার্থনা করে ও মেনে চলে

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, মু’মিন বান্দারা তো আল্লাহ্‌র হিদায়াত লাভ করেই ফেলেছে, সুতরাং সালাতে কিংবা বাইরে আর হিদায়াত চাওয়ার আর প্রয়োজন কি?

তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর হল, এতে উদ্দেশ্য হচ্ছে হিদায়াতের উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক চাওয়া। কেননা বান্দা প্রতিটি মুহূর্তে ও সকল ক্ষেত্রে প্রতি নিয়তই আল্লাহ্‌র মুখাপেক্ষী। সে নিজে নিজের জীবনের লাভ ক্ষতির মালিক নয়। বরং সকল ব্যাপারে সাফল্যের ক্ষেত্রে সে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। এ জন্যেই আল্লাহ্‌ পাক তাকে শিখিয়েছেন যে, সে যেন সর্বদা হিদায়াত প্রার্থনা করে এবং সবসময় তার উপর থাকতে পারে সেই তাওফীক যেন আল্লাহ্‌ পাক তাকে দান করেন। সত্যি কথা বলে সেই ব্যক্তিই ভাগ্যবান যাকে আল্লাহ্‌ তাঁর দরজায় ভিক্ষুক করে নিয়েছেন। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও মুহতাজ ব্যক্তি যখন দিনরাত আল্লাহ্‌কে ডাকতে তাহকে এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দু’আ করে, আল্লাহ্‌ তখন তার সেই আকুল প্রার্থনা কবুলের জিম্মাদার হয়ে যান। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেনঃ

﴿يَـأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ ءَامِنُواْ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَـبِ الَّذِى نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَـبِ الَّذِى أَنَزلَ مِن قَبْلُ﴾

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহ্‌র প্রতি ও তাঁর রসূলের প্রতি এবং এ কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং ঐ কিতাবের প্রতি যা পূর্বে অবতীর্ণ করেছিলেন। [৪:১৩৬]

এ আয়াতে বিশ্বাসীদেরকে ঈমান আনয়নের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যেভাবে হিদায়াত প্রাপ্তগণকে হিদায়াত চাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই দুই স্থানেই উদ্দেশ্য হচ্ছে তার উপরে অটল, অনড় ও দ্বিধাহীনচিত্তে স্থির থাকা। আর এমন সবসময় এমন কাজ করতে থাকা যা তার এই উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হবে।

এর উপর এ প্রতিবাদ উঠতে পারে না যে, এ তো হলো, ‘তাহসীলে হাসিল’ অর্থাৎ প্রাপ্ত জিনিসের পুনঃ প্রাপ্তি। আল্লাহ্‌ এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। দেখুন আল্লাহ্‌ তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে নিম্নের এ দু’আ করারও নির্দেশ দিচ্ছেন,

﴿رَبَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ ﴾

হে প্রভু! আমাদেরকে হিদায়াত করার পর আমাদের অন্তরসমূহকে বাঁকা করে দিবেন না এবং আমাদেরকে আপনার নিকট হতে করুণা প্রদান করুন, নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা। [৩:৮]

﴿اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ﴾

সুতরাং ‘আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন’ এর অর্থ দাঁড়ায়,

হে আল্লাহ্‌! আমাদেরকে সরল ও সোজা পথের উপর অটল ও স্থির রাখুন। এবং তা হতে আমাদেরকে দূ্রে অপসারিত করে ফেলবেন না।

﴿صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّآلِّينَ ﴾

৭. তাদের পথ, যাদেরকে আপনি অনুগ্রহ দান করেছেন, তাদের (পথ) নয় যারা আপনার রোষে পতিত হয়েছে এবং তাদেরও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

ইতিপূর্বে আমরা একটি হাদীস উল্লেখ করেছিলাম যে, যখন বান্দা বলে,

﴿اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ﴾

(আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন) তখন আল্লাহ বলেন, “এটা আমার বান্দার জন্য, এবং আমার বান্দা যা চেয়েছে তাই পাবে।”

যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ দান করেছেন তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে সূরা নিসায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

﴿وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَـئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَآءِ وَالصَّـلِحِينَ وَحَسُنَ أُولَـئِكَ رَفِيقاً – ذلِكَ الْفَضْلُ مِنَ اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ عَلِيماً ﴾

আর যে কেউ আল্লাহ ও বার্তাবাহকের (মুহাম্মাদ صلى الله عليه  وسلم  ) অনুগত হয়, তবে তারা ঐ সকল ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নাবীগণ, সিদ্দিক্বীন (প্রকৃত বিশ্বাসীগণ) , শাহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী। এটাই আল্লাহর অনুগ্রহ এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (৪:৬৯-৭০) আল্লাহর বাণী,

﴿غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّآلِّينَ﴾

( তাদের (পথ) নয় যারা আপনার রোষে পতিত হয়েছে এবং তাদেরও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।) এর মানে হচ্ছেহে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করুন, ঐ সব লোকের পথ যাদেরকে আপনি পুরস্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াত বা সুপথ প্রাপ্ত এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল(স) –এর অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী ও নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে-বহুদূরে অবস্থানকারী ছিলেন। আর ঐ সব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোকদের পথ হতেও আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞানই নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকে সরল, সঠিক পুণ্য পথ দেখানো হয় না।

কথার মধ্যে খুব বেশী গুরুত্ব আরোপ করার জন্যে এখানে ‘লা’ অক্ষরটিকে ‘গইর’ এর পরে আনা হয়েছে, যেন জানতে পারা যায় যে, এখানে ভুলপথ দুইটি। তা হল ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের পথ, এই পথ দুইটির পার্থক্য ঈমানদারদের অনুধাবন করতে হবে যাতে করে তারা এটা এড়িয়ে চলতে পারে। বিশ্বাসীদের পথ তো এটাই যে, সত্যর জ্ঞানও থাকতে হবে এবং তার ‘আমালও থাকতে হবে। ইয়াহূদীদের ‘আমাল নেই এবং খৃষ্টানদের জ্ঞান নেই। এজন্যেই ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত আর খৃষ্টানরা পথভ্রষ্ট। কেননা, জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘আমাল পরত্যাগ করা অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খৃষ্টানেরা যদিও সত্য জানার চেষ্টা করে তবু তারা সঠিক পথ পায় না। কেননা তাদের কর্মপন্থা ভুল এবং তারা সত্যের অনুসরণ হতে দূরে সরে পড়েছে। অভিশাপ পথভ্রষ্টতা এই দুই দলের তো রয়েছেই কিন্তু ইয়াহূদী অভিশাপের অংশে একধাপ এগিয়ে রয়েছে। আল্লাহ কুর’আন কারীমে ইয়াহূদীদের ব্যাপারে বলেছেন,

﴿مَن لَّعَنَهُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ﴾

যাদেরকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন এবং যাদের প্রতি তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। [৫:৬০]

খৃষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,

﴿قَدْ ضَلُّواْ مِن قَبْلُ وَأَضَلُّواْ كَثِيراً وَضَلُّواْ عَن سَوَآءِ السَّبِيلِ﴾

যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। [৫:৭৭]

এ ব্যাপারে সালাফগণদের দ্বারা বহু হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, আদী বিন হাতিম (র) বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ (স) এর অশ্বারোহী বাহিনী একদিন আমার ফুফুকে এবং কতগুলো লোককে বন্দী করে রসূলুল্লাহ (স) এর নিকট এনে হাজির করেন। আমার ফুফু তখন বলেন, ‘আমাকে দেখা শোনা করার লোক দুরে সরে রয়েছে এবং আমি একজন অধিক বয়স্কা অচলা বৃদ্ধা। আমি কোন খিদমতের যোগ্য নই। সুতরাং দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহ আপনার উপরও দয়া করবেন।’ তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যে তোমার খবরাখবর নিয়ে থাকে সে ব্যক্তিটি কে? তিনি বললেন, ‘আদী বিন হাতিম।’ রসূলুল্লাহ (স) বললেন, ‘সে ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (স) হতে এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’ তারপর তিনি (স) তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেন। এরপর যখন রসূলুল্লাহ (স) ফিরে আসেন, তখন তাঁর সাথে আরেকজন লোক ছিলেন। খুব সম্ভবত তিনি আলী (র) ছিলেন। তিনি বললেন,’যাও তাঁর কাছে গিয়ে সওয়ারীর কথা বল।’ আমার ফুফু নাবী (স) এর কাছে যেয়ে তা চাইলেন এবং তাকে সওয়ারী দিয়ে দেয়া হল। তিনি সেখান হতে মুক্ত হয়ে সোজা আমার নিকট চলে আসেন এবং বলেন, ‘তাঁর (মুহাম্মাদ) দানশীলতা তোমার পিতা হাতিমকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর কাছে একবার কেউ গেলে আর শূন্য হাতে ফিরে আসেনা।’ একথা শুনে আমিও রসূলুল্লাহ (স) এর কাছে হাজির হই। সেখানে যেয়ে দেখলাম যে কিছু ছোট ছেলে ও বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে অবাধে যাতায়াত করছে এবং তিনি তাদের সাথে আন্তরিকভাবে কথাবার্তা বলছেন। এ দেখে আমার বিশ্বাস হলো যে, তিনি কাইসার (Caesar) বা কিসরার (King of Persia) এর মত বিশাল রাজত্ব ও সম্মানের অভিলাষী নন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, আদী! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা হতে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য আছে কি? আল্লাহু আকবার বলা হতে তুমি কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? মহান আল্লাহ পাক থেকে বড় আর কেউ আছে কি? (তাঁর এই কথাগুলো এবং তাঁর সরলতা ও অকৃত্রিমতা আমার উপর এমনভাবে দাগ কাটলো যে,) আমি তৎক্ষণাৎ কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলাম। তাতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বললেন,

«إِنَّ الْمَغْضُوبَ عَلَيْهِمُ الْيَهُودُ وَ إِنَّ الضَّالِينَ النَّصَارَى»

‘যাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, তারা হচ্ছে ইহুদি, আর যারা ভুল পথে আছে তারা হচ্ছে খৃষ্টান।’

এই হাদীসটি আত-তিরমিজীতেও বর্ণিত আছে এবং তিনি এটিকে হাসান ‘গরীব বলেছেন।

সহীহ বুখারীতে এরূপ একটি হাদীসের উল্লেখ আছে যে, যাইদ বিন আমার বিন নুফাইল যখন খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে স্বীয় বন্ধুবান্ধব সহ বেরিয়ে পড়লেন এবং এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পর সিরিয়ায় আসলেন, তখন ইয়াহূদীরা তাদেরকে বললঃ ‘আল্লাহর অভিশাপের কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা ইয়াহূদী ধর্মে আসতে পারবেন না।’ তিনি বললেন, “তা হতে বাচার উদ্দেশ্যেই তো আমরা সত্য ধর্মের অনুসন্ধানে বের হয়েছি, কাজেই কিরূপে তা গ্রহণ করতে পারি?’ খৃষ্টানদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তারা বলল, ‘আল্লাহ তা’আলার অসন্তুষ্টির কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মেও আসতে পারবেন না।’ তিনি বললেন, ‘আমি এটাও করতে পারি না।’ অতঃপর তিনি স্বাভাবিক ধর্মের উপরই রয়ে গেলেন। তিনি মূর্তি পূজা ও স্বগোত্রীয় ধর্মত্যাগ করলেন, কিন্তু ইয়াহূদী ও খৃষ্টান ধর্ম কোন ক্রমেই গ্রহণ করলেন না। তবে তাঁর বন্ধুরা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো, কেননা ইয়াহূদীদের ধর্মের সঙ্গে এর অনেকটা মিল ছিল। যাইদের ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ওয়ারাকা বিন নাওফিল। তিনি রসূলুল্লাহ (স) এর নাবুওয়াতের যুগ পেয়েছিলেন এবং আল্লাহর হিদায়াত তাঁকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছিল। তিনি রসূলুল্লাহ (স) এর উপর ঈমান এনেছিলেন ও সেই সময় পর্যন্ত যে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন।

< পূর্বের পৃষ্ঠা ▬▬▬▬▬ পরের পৃষ্ঠা > 

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: