//
আল-ক্বদ্‌র এর রাতের সুনির্দিষ্টকরণ এবং এর লক্ষণ

ইমাম আহমাদ উবাদাহ বিন আস-সামিত থেকে রেকর্ড করেছেন যে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْبَوَاقِي، مَنْ قَامَهُنَّ ابْتِغَاءَ حِسْبَتِهِنَّ فَإِنَّ اللهَ يَغْفِرُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، وَهِيَ لَيْلَةُ وِتْرٍ: تِسْعٍ أَوْ سَبْعٍ أَوْ خَامِسَةٍ أَوْ ثَالِثَةٍ أَوْ آخِرِ لَيْلَة»

(আল-ক্বদ্‌র রয়েছে শেষ দশ (রাতে)। যে ব্যক্তি পুরস্কারের খোঁজে (সলাতে) দাঁড়ায়, আল্লাহ নিশ্চয় তার পূর্বের ও পরের সব পাপ মাফ করে দেবেন। এটা বেজোড় রাতেঃ (রমাদনের) একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ অথবা ঊনত্রিশতম রাতে।) আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

«إِنَّ أَمَارَةَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَنَّهَا صَافِيَةٌ بَلْجَةٌ، كَأَنَّ فِيهَا قَمَرًا سَاطِعًا، سَاكِنَةٌ سَاجِيَةٌ، لَا بَرْدَ فِيهَا وَلَا حَرَّ، وَلَا يَحِلُّ لِكَوْكَبٍ يُرْمَى بِهِ فِيهَا حَتْى يُصْبِحَ، وَإِنَّ أَمَارَتَهَا أَنَّ الشَّمْسَ صَبِيحَتَهَا تَخْرُجُ مُسْتَوِيَةً لَيْسَ لَهَا شُعَاعٌ، مِثْلَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، وَلَا يَحِلُّ لِلشَّيْطَانِ أَنْ يَخْرُجَ مَعَهَا يَوْمَئِذ»

(আল-ক্বদ্‌রের রাতের নিদর্শন হচ্ছে এ রাতটি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। যেন মনে হয় তাতে উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ ও শান্ত চাঁদ উঠেছে। না ঠান্ডা না গরম। সকালের আগে কোন উল্কা নিক্ষিপ্ত হয় না। এর নিদর্শন হচ্ছে পরবর্তী দিনে সূর্য প্রখর কিরণের সাথে উদিত হয় না। বরং তা হয় পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়। সেদিন ওর সাথে শয়তানও আত্মপ্রকাশ করে না।) এর হাদীসটির বর্ণনার সূত্র ভাল। তবে এতে কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে এবং এর শব্দে কিছু জিনিস আছে যা প্রশ্নবিদ্ধ।

আবু দাঊদ তার সুনানে প্রত্যেক রমাদনে আল-ক্বদ্‌রের রাতের প্রমাণ শীর্ষক একটি অধ্যায় সংযুক্ত করেছেন। তিনি এতে লিখেছেন যে, আব্দুল্লাহ বিন উমার বলেছেন, আমি শুনছিলাম যে আল্লাহর রসূলকে আল-ক্বদ্‌র এর রাত নিয়ে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বললেন,

«هِيَ فِي كُلِّ رَمَضَان»

(প্রত্যেক রমাদনেই এটা ঘটে।) এই হাদীসটির সানাদের সবাই নির্ভরযোগ্য। তবে আবূ দাঊদ বলেছেন যে শুবাহ ও সুফিয়ান উভয়েই এটা ইসহাক্ব থেকে বর্ণনা করেছেন এবং তারা উভয়েই একে সহাবীর (ইবনু উমার) উক্তি বলে বিবেচনা করেছেন।

আবু সাঈদ আল-খুদ্রি থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে যে তিনি বলেছেন, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদনের প্রথম দশ দিনে ইতিকাফ করলেন। আমরাও তাঁর সাথে ইতিকাফ করলাম। এরপর জিব্রিল তাঁর কাছে এসে বললেন, আপনি যা খুঁজছেন তা আরও সামনে। সুতরাং নাবী রমাদনের মাঝের দশ রাতে ইতিকাফ করলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে ইতিকাফ করলাম। এরপর আবার জিব্রিল এসে বললেন, আপনি যা খুঁজছেন তা আরও সামনে। অতপর নাবী ২০ রমাদনের সকালে দাঁড়িয়ে (উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে) বললেন,

«مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِيَ فَلْيَرْجِعْ فَإِنِّي رَأَيْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَإِنِّي أُنْسِيتُهَا، وَإِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي وِتْرٍ، وَإِنِّي رَأَيْتُ كَأَنِّي أَسْجُدُ فِي طِينٍ وَمَاء»

(যারা আমার সাথে ইতিকাফ করেছে, তারা যেন (আবার ইতিকাফ করার) জন্য ফিরে আসে, কারণ নিশ্চয় আমি আল-ক্বদ্‌র এর রাত দেখেছি কিন্তু আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে তা নিশ্চয় শেষ দশকে। এটা বেজোড় রাতে। আর আমি আমাকে কাদামাটিতে সিজদাহ করতে দেখেছি।)

মাসজিদের ছাদ ছিল খেজুর পাতার তৈরি। আকাশে তখন মেঘের কোন চিহ্নও ছিল না। হঠাৎ মেঘ উঠলো এবং বৃষ্টি হল। নাবী আমাদেরকে সলাতে নেতৃত্ব দিলেন এবং আমরা আল্লাহর রসূলের কপালে কাদামাটির দাগ দেখতে পারলাম। তাঁর স্বপ্ন সত্য প্রমাণিত হল।

অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে, এটি ঘটেছিল একুশ রাতের পরবর্তী সকালে। তারা দুজনেই (বুখারী ও মুসলিম) এটি তাদের দুই সহীহ হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। আশ-শাফিঈ বলেছেন, এ ধরণের যত বর্ণনা রয়েছে তার মধ্যে এটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ।

সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ বিন উনাইস কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসের আলোকে এই রাত তেইশতম রাতে হয় এমনটাও বলা হয়। অন্য আরেকটি মত হচ্ছে এই রাত পঁচিশতম রাতে। আল-বুখারী, ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى، فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى، فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى»

(ক্বদ্‌র এর রাতকে রমাদনের শেষ দশকে খোঁজ কর। প্রথমে নয়, তারপর সাত, তারপর পাঁচ বাকি থাকে।) অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এর দ্বারা বেজোড় রাতকে বোঝানো হয়েছে। এটাই সর্বাধিক স্পষ্ট এবং প্রসিদ্ধ মত।

ক্বদ্‌রের রাত রমাদনের সাতাশতম রাতে হয় বলেও উল্লেখ রয়েছে। সহীহ মুসলিমে উবাই বিন কাব সংকলিত একটি হাদীসে রয়েছে যে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে সাতাশতম রাতে উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আহমাদ, যির থেকে সংকলন করেছেন যে, তিনি উবাই বিন কাবকে জিজ্ঞেস করেছেন, হে আবু আল-মিনযির! আপনার ভাই ইবনু মাসঊদ বলতেন, যে ব্যক্তি বছরের প্রত্যেক রাতে জেগে থাকবে সে ক্বদ্‌রের রাত পেয়ে যাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হোক। তিনি জানতেন যে এ রাত রমাদনের মধ্যে রয়েছে এবং তা সাতশতম রাতে।এরপর তিনি আল্লাহর নামে শপথ করলেন। যির তারপর বললেন, আপনি এটা কি করে জানলেন? উবাই উত্তর দিলেন, আমাদের যে সব নিদর্শনের কথা বলা হয়েছে সে সব দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি। যেমন ঐ দিন সূর্য কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়। মুসলিমও এই হাদীসটি সংকলন করেছেন।

আল-ক্বদ্‌রের রাত রমাদনের ঊনত্রিশতম রাতেও হতে পারে। ইমাম আহমাদ ইবনু হানবাল, উবাদাহ বিন আস-সামিত থেকে সংকলন করেছেন যে, তিনি আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল-ক্বদ্‌রের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছেন,

«فِي رَمَضَانَ فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، فَإِنَّهَا فِي وِتْرٍ إِحْدَى وَعِشْرِينَ، أَوْ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ تِسْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَة»

(রমাদনের শেষ দশ রাতে এর খোঁজ কর। কারণ নিশ্চয় এটা বেজোড় রাতে অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ ঊনত্রিশ বা শেষ রাতে।)

ইমাম আহমাদ, আবূ হুরইরহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল-ক্বদ্‌রের রাত প্রসঙ্গে বলেছেন,

«إِنَّهَا لَيْلَةُ سَابِعَةٍ أَوْ تَاسِعَةٍ وَعِشْرِينَ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ فِي الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ الْحَصَى»

(নিশ্চয় তা হল সাতাশতম বা ঊনত্রিশতম রাতে। ঐ রাতে পৃথিবীতে যেসকল মালাইকারা থাকে তাদের সংখ্যা শিলাখণ্ডের চেয়েও বেশী হয়।) আহমাদ একাই এই হাদিসটি সংকলন করেছেন এবং এর বর্ণনা সূত্র বিশুদ্ধ।

আবু ক্বিলাবাহ থেকে আত-তিরমিযী সংকলন করেছেন যে তিনি বলেছেন, আল-ক্বদ্‌রের রাত রমাদনের শেষ দশ রাতের মধ্যে (প্রতি বছরে) রদবদল হয়। এটি মালিক, আস-সাওরি, আহমাদ বিন হানবাল, ইসহাক্ব বিন রাহুইয়াহ, আবু সাওর, আল-মুযানি, আবু বাক্‌র বিন খুযাইমাহসহ আরও অনেকে বর্ণনা করেছেন। আশ-শাফিঈ থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা আল-ক্বদি তার থেকে উল্লেখ করেছেন, এবং এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য মতামত।

আল্লাহই ভাল জানেন।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: